দক্ষিণ কোরিয়ায় জিকেএস (GKS) স্কলারশিপের আদ্যোপান্ত
কে-পপ, কে-ড্রামা এবং অত্যাধুনিক টেকনোলজির কল্যাণে দক্ষিণ কোরিয়া এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিত। শিক্ষার মান এবং উন্নত জীবনযাত্রার জন্য কোরিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। আর কোরিয়া সরকারের সবচেয়ে বড় স্কলারশিপ প্রোগ্রাম হলো Global Korea Scholarship (GKS), যা আগে KGSP নামে পরিচিত ছিল।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট (ব্যাচেলর), মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ দেওয়া হয়। চলুন জেনে নিই জিকেএস স্কলারশিপের বিস্তারিত নিয়মকানুন।
কী কী সুবিধা (Benefits) পাওয়া যায়?
GKS হলো একটি সম্পূর্ণ অর্থায়িত স্কলারশিপ। স্কলারশিপ পেলে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়:
- সম্পূর্ণ টিউশন ফি: ব্যাচেলর (৪ বছর) বা মাস্টার্স/পিএইচডির (২/৩ বছর) সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ।
- মাসিক স্টাইপেন্ড: ব্যাচেলর লেভেলে প্রতি মাসে ৯ লক্ষ কোরিয়ান ওন (KRW) এবং মাস্টার্স/পিএইচডিতে ১০ লক্ষ কোরিয়ান ওন (প্রায় ৮৫-৯০ হাজার বাংলাদেশি টাকা) প্রদান করা হয়।
- বিমান ভাড়া: শুরু এবং শেষে ইকোনোমি ক্লাসের রিটার্ন এয়ার টিকিট।
- সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স: কোরিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রাথমিক খরচের জন্য এককালীন ২ লক্ষ ওন প্রদান করা হয়।
- কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণ ফি: মূল ডিগ্রি শুরুর আগে ১ বছরের বাধ্যতামূলক কোরিয়ান ভাষা কোর্সের সম্পূর্ণ খরচ সরকার বহন করে।
- রিসার্চ ও থিসিস অ্যালাউন্স: মাস্টার্স/পিএইচডির থিসিস প্রিন্টিং ও গবেষণার জন্য অতিরিক্ত ফান্ড।
আবেদনের যোগ্যতা (Eligibility)
- বয়সসীমা: ব্যাচেলরের ক্ষেত্রে বয়স ২৫ বছরের কম এবং মাস্টার্স/পিএইচডির ক্ষেত্রে ৪০ বছরের কম হতে হবে (নির্দিষ্ট তারিখ সার্কুলারে উল্লেখ থাকে)।
- একাডেমিক রেজাল্ট: পূর্ববর্তী ডিগ্রিতে আপনার সিজিপিএ (CGPA) কমপক্ষে ৮০% বা ২.৬৪ (৪.০০ এর মধ্যে) হতে হবে।
- নাগরিকত্ব: আবেদনকারী এবং তার পিতামাতা কাউকেই কোরিয়ার নাগরিক হওয়া যাবে না।
- স্বাস্থ্য: কোরিয়ায় দীর্ঘদিন থাকার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে।
বাধ্যতামূলক ১ বছরের কোরিয়ান ভাষা কোর্স
জিকেএস স্কলারশিপের সবচেয়ে ইউনিক নিয়ম হলো এর ভাষা শিক্ষা। আপনি ইংরেজিতে পড়তে যান বা কোরিয়ান ভাষায়— স্কলারশিপ পেলে প্রথম ১ বছর আপনাকে শুধু কোরিয়ান ভাষা শিখতে হবে। ১ বছর পর TOPIK (Test of Proficiency in Korean) লেভেল ৩ অর্জন করতে পারলেই কেবল আপনার মূল মাস্টার্স বা ব্যাচেলর ডিগ্রি শুরু হবে। তবে আপনি যদি বাংলাদেশ থেকেই TOPIK লেভেল ৫ বা ৬ অর্জন করে যান, তবে ভাষা কোর্স করতে হবে না।
আবেদনের দুটি ট্র্যাক (Embassy vs University Track)
জাপানের MEXT স্কলারশিপের মতো GKS-এও আবেদনের দুটি উপায় রয়েছে (যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে):
১. এম্বাসি ট্র্যাক (Embassy Track)
- আপনাকে বাংলাদেশে অবস্থিত কোরিয়ান দূতাবাসে (Korean Embassy in BD) সব ডকুমেন্টস জমা দিতে হবে।
- এই ট্র্যাকে আপনি আপনার পছন্দের ৩টি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
- এম্বাসি আপনার ডকুমেন্টস যাচাই করে ইন্টারভিউ নেবে এবং শর্টলিস্ট করে কোরিয়াতে পাঠাবে (NIIED-এর কাছে)। এরপর ওই ৩টির মধ্যে যেকোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করবে।
২. ইউনিভার্সিটি ট্র্যাক (University Track)
- এই ট্র্যাকে এম্বাসির কোনো কাজ নেই। আপনাকে সার্কুলারে দেওয়া নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যেকোনো ১টিতে সরাসরি আবেদনপত্র পাঠাতে হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ইন্টারভিউ করে নির্বাচন করলে তারা আপনার নাম NIIED-এর কাছে পাঠাবে।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস এবং 'অ্যাপোস্টাইল (Apostille)'
জিকেএস স্কলারশিপের ডকুমেন্টস রিকোয়ারমেন্ট অত্যন্ত কঠোর। নিচের ডকুমেন্টসগুলো লাগবে:
- GKS Application Form, Personal Statement এবং Study Plan।
- দুটি Recommendation Letter।
- নাগরিকত্বের প্রমাণ (নিজের এবং বাবা-মায়ের পাসপোর্ট বা জন্মসনদ)।
- একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেট: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! আপনার সব সার্টিফিকেট অবশ্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে Apostille (অ্যাপোস্টাইল) বা কনস্যুলার অ্যাটেস্টেশন করা থাকতে হবে। সাধারণ নোটারি করা কপি কোরিয়া সরকার গ্রহণ করে না।
💡 প্রো টিপস (Pro Tips)
কোরিয়ানরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে খুব ভালোবাসে। আপনার Personal Statement-এ কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি আপনার আগ্রহ এবং কোরিয়ান ভাষা শেখার মোটিভেশন স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন। এছাড়া, এম্বাসি ট্র্যাকে আবেদন করলে আপনার সব ডকুমেন্টের মূল কপিসহ অতিরিক্ত ৩টি ফটোকপি (মোট ৪ সেট) জমা দিতে হয়, এই বিষয়টি মাথায় রেখে আগে থেকেই অ্যাটেস্টেশন করিয়ে রাখবেন।