শেভনিং স্কলারশিপ (Chevening): কোনো খরচ ছাড়াই যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO) দ্বারা পরিচালিত শেভনিং (Chevening) স্কলারশিপ হলো গ্লোবাল লিডার তৈরি করার একটি অসামান্য উদ্যোগ। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বহু মেধাবী পেশাজীবী ও শিক্ষার্থী এই ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১ বছর মেয়াদি মাস্টার্স করার সুযোগ পান।
শেভনিং অন্যান্য সাধারণ স্কলারশিপ থেকে একেবারেই আলাদা। কারণ, এখানে শুধু সিজিপিএ (CGPA) দেখা হয় না; বরং প্রার্থী কতটা বড় মাপের লিডার হতে পারবেন, সেই পটেনশিয়ালকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। চলুন জেনে নিই এই প্রেস্টিজিয়াস স্কলারশিপের আদ্যোপান্ত।
শেভনিং স্কলারশিপে কী কী সুবিধা দেওয়া হয়?
এই স্কলারশিপ পেলে আপনাকে আর্থিক বিষয়ে একদমই ভাবতে হবে না। এর আওতায় যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়:
- টিউশন ফি: বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ টিউশন ফি স্কলারশিপ থেকে কাভার করা হয়।
- মাসিক স্টাইপেন্ড: থাকা-খাওয়া ও হাতখরচের জন্য প্রতি মাসে পর্যাপ্ত অ্যালাউন্স (লন্ডনের ভেতরে থাকলে বেশি, বাইরে থাকলে কিছুটা কম)।
- ট্রাভেল কস্ট: বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়া এবং পড়া শেষে ফিরে আসার ইকোনোমি ক্লাসের বিমান ভাড়া।
- অ্যারাইভাল ও ডিপার্চার অ্যালাউন্স: যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর সেটেল হওয়ার জন্য এবং দেশে ফেরার সময় অতিরিক্ত লাগেজ খরচের জন্য এককালীন ভাতা।
- ভিসা ও টিবি টেস্ট: যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট ভিসার সম্পূর্ণ খরচ এবং যক্ষ্মা (TB) টেস্টের ফি রিইম্বার্স করা হয়।
- শেভনিং নেটওয়ার্ক: সারাবিশ্বের লিডারদের সাথে এক্সক্লুসিভ নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে অংশ নেওয়ার সুযোগ।
আবেদনের যোগ্যতা (Eligibility Criteria)
আবেদন করার আগে নিচের শর্তগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে:
- যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট (স্নাতক) ডিগ্রি সম্পন্ন থাকতে হবে। (সাধারণত ২:১ বা ফার্স্ট ক্লাস সমমানের সিজিপিএ)।
- অন্তত ২ বছরের (২৮০০ ঘণ্টা) কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এটি ফুল-টাইম, পার্ট-টাইম, পেইড ইন্টার্নশিপ বা ভলান্টারি ওয়ার্কও হতে পারে।
- যুক্তরাজ্যের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি ভিন্ন ভিন্ন (তবে সামঞ্জস্যপূর্ণ) মাস্টার্স কোর্সে আবেদন করতে হবে। স্কলারশিপ পেতে হলে অন্তত ১টি কোর্স থেকে Unconditional Offer Letter পেতে হবে।
শেভনিংয়ের প্রাণ: ৪টি এসে (Essays)
শেভনিং স্কলারশিপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবেদনপত্রের ৪টি এসে (Essay) লেখা। প্রতিটি এসে সর্বোচ্চ ৫০০ শব্দের মধ্যে হতে হবে। এই ৪টি এসে হলো:
- Leadership and Influence: আপনি কীভাবে আপনার কর্মক্ষেত্রে বা সমাজে লিডারশিপ দেখিয়েছেন এবং পজিটিভ পরিবর্তন এনেছেন।
- Networking: আপনি কীভাবে মানুষের সাথে সম্পর্ক (Network) তৈরি করেন এবং ভবিষ্যতে শেভনিং নেটওয়ার্ককে কীভাবে কাজে লাগাবেন।
- Studying in the UK: আপনি কেন যুক্তরাজ্যের নির্দিষ্ট ওই ৩টি কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছেন? এটি আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে কতটা প্রাসঙ্গিক?
- Career Plan: পড়ালেখা শেষে দেশে ফিরে আপনার শর্ট-টার্ম এবং লং-টার্ম ক্যারিয়ার গোল কী?
আবেদন প্রক্রিয়া ও টাইমলাইন
শেভনিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। টাইমলাইনটি সাধারণত এরকম হয়:
- আগস্ট-সেপ্টেম্বর: অনলাইনে শেভনিংয়ের পোর্টালে (OAS) আবেদন শুরু হয়।
- নভেম্বর: আবেদনের ডেডলাইন শেষ হয়।
- ফেব্রুয়ারি-মার্চ: শর্টলিস্টেড প্রার্থীদের ইন্টারভিউয়ের জন্য ইমেইল করা হয়।
- মার্চ-এপ্রিল: ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনে ভাইভা বা ইন্টারভিউ অনুষ্ঠিত হয়।
- জুন-জুলাই: চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের Unconditional Offer Letter জমা দিতে হয়।
- সেপ্টেম্বর-অক্টোবর: স্কলাররা যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।
ভিসা এবং দেশে ফেরার শর্ত (Return Policy)
শেভনিং স্কলারদের যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা (Tier 4) দেওয়া হয়। তবে ফুলব্রাইট স্কলারশিপের মতো শেভনিংয়েরও একটি অন্যতম বড় শর্ত হলো Home Return Policy।
আপনার মাস্টার্স কোর্স শেষ হওয়ার পর আপনাকে অবশ্যই বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে এবং অন্তত ২ বছর দেশে অবস্থান করতে হবে। আপনি পিএইচডি করতে চাইলেও আগে দেশে ফিরে ২ বছর থাকতে হবে। স্কলারশিপের উদ্দেশ্যই হলো আপনি যুক্তরাজ্য থেকে জ্ঞান অর্জন করে তা নিজ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাবেন।
💡 প্রো টিপস (Pro Tips)
আপনার ৪টি এসে (Essay) লেখার ক্ষেত্রে STAR Method (Situation, Task, Action, Result) ফলো করুন। মনগড়া গল্প না লিখে বাস্তব জীবনের নির্দিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করুন, যেখানে আপনার লিডারশিপের কারণে কোনো সমস্যার সমাধান হয়েছে। আর হ্যাঁ, ডেডলাইনের জন্য অপেক্ষা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি অফার লেটার ম্যানেজ করার কাজ দ্রুত শুরু করে দিন।